গল্প : পাখির ভাষা

 


      পাখির ভাষা    ||    জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

পাখির ভাষা শেখার ভূত মাথায় চাপলে হরিদাদু ছাড়া গতি নেই।তিনি চব্বিশটা বই ঘেঁটে
অনেক শেখালেন।তারপর রাত্রে পক্ষীবিশারদ সালিম আলিকে প্ল্যানচেটে ডাকলেন।যেটুকু
বাকি ছিলো জেনে নিয়ে আলি সাহেবকে আমরা স্যালুট দিলুম।তবে দুজনেই আমাকে খুব সাবধানে
পাখিভাষা প্রয়োগ করতে বললেন কেন কে জানে! 
তেষট্টি দিন ভোকাল ট্রেনিংয়ের পর আমার হেঁড়ে গলা থেকে প্রায় পাখির ডাকের মতো কোনো একটা আওয়াজ
বের হলো আর আমগাছ থেকে একটা শালিক এসে আদুরে গলায় কুরুলে উঠলো।
  ঠাকুরমার ঝুলির হীরামন পাখি ভবিষ্যৎ বলে দিত শুনেছি কিন্তু শালিকটিও সেই ক্ষমতার অধিকারী, জানা ছিলো না।
  আমার আওয়াজ শুনে ও মুখভঙ্গি দেখে বিনি ঠাকুমা বাঁকা চোখে তাকালো,বুঝলুম,বিপদ আসছে।
বিনি ঠাকুমা ভীষণ মুখরা আর লাগিয়ে-ভাঙিয়ে আগুন জ্বালাতে তার জুড়ি নেই।পাড়ার ছেলেদের
সে চক্ষুশূল কারণ, যতবার তারা মার খায় তার বেশিটাই ওই ঠাকুমার কারসাজি।
আশঙ্কা সত্য,শোনা গেল,ছোটোবৌ,তোর ছেলেটাকে পাগলের ডাক্তার দেখা।কীসব পাগলের মতো
আওয়াজ আর অঙ্গভঙ্গি করছে,মাথাটা একবারে গ্যাছে।হায় হায়!!
আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি,তবু বকুনির ভয়ে বাইরে চলে গেলুম।
বাগানে গিয়ে প্র‍্যাকটিসের জন্য যেই কয়েকটা ডাক ছেড়েছি সেই শালিক আর একটা ফিঙে
খুব কাছে এসে বসলো।
কুশল বিনিময়ের পর শালিকটি বলে,তোমাদের বিনি ঠাকুমা এবার খুব জব্দ হবে।
আমি সোৎসাহে বললুম,কী ব্যাপার বলো তো?
পাখি ঘাড় নেড়ে উত্তর দেয়,আজই সে কলতলায় যাবে আর তারপর দ্যাখো না কী হয়!
সে চোখ মিটমিট করে আবার বলে,কুচুটে বুড়ি শুধু ছোটোদের মার খাওয়ায়!
কী হবে তা পাখি বললো না।মনে মনে বেশ উত্তেজনা অনুভব করি।
বাড়িতে ঢুকে দেখি ঠাকুমা তখনো মায়ের মগজধোলাই করে চলেছে।মা-জেঠিমারা কেউ তাকে পছন্দ করে না,
কিন্তু তা বলার সাহস নেই।পাড়ার বড়োদের সে পিসিমা,সবার ভুল ধরা আর জ্ঞান দেওয়া তার কাজ।
সারাদিন পাড়ায় ঘুরে সে ওসবই করে।
-- দ্যাখ ছোটোবৌ,ছেলেপিলেদের খুব শাসনে রাখবি,নইলে বিয়ের পর....
আমার দিকে চোখ পড়তেই চুপ,আমি হাসছি দেখে মুখ বাঁকিয়ে বিষ ঢালে,ওই দ্যাখ,আমাকে কেমন
মুখ ভ্যাঙাচ্ছে!
আমি থ ! কিছুই যে করিনি!
-- তুই যদি ছেলেকে শাস্তি না দিস,আমি তোদের বাড়িতে আর পা-ই রাখবো না! -- এই বলে রাগে-দর্পে
যেতে গিয়ে জোর পিছলে হাত তিনেক দূরে ঠাকুমা চিৎপটাং,সিঁড়িতে লেগে তার সামনের তিনটে
দাঁত পুরো আউট আর চিল-চিৎকার! ভাঙা দাঁতের ফাঁকে গলার স্বর বিকৃত হয়ে যাচ্ছে।
পেয়ারা গাছে ফিঙেটা ডেকে উঠলো,ঠ্যাঁও! ঠ্যাঁও!
-- মানে 'ঠিক হয়েছে'!
আমি হাসতে গিয়েও হাসতে পারি না,ছুটে যাই ঠাকুমাকে তুলতে।


Comments

Popular posts from this blog

কবতা : গ্রামনাম সিরিজ